ওসমান হাদি: এক অমর শহীদের কান্নাভেজা বিদায়
মোহাম্মাদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী | ১৯ ডিসেম্বর ২০২৫
ঝালকাঠির নলছিটির এক সাধারণ গ্রামে জন্ম নেওয়া শরিফ ওসমান বিন হাদি—যাকে আমরা ভালোবাসায় ওসমান হাদি বলে ডাকি—তার জীবন ছিল এক অবিরাম সংগ্রাম আর অটুট স্বপ্নের কাহিনী। একজন মাদ্রাসা শিক্ষকের সংসারে, ছয় ভাইবোনের মধ্যে সবচেয়ে ছোট সন্তান হিসেবে বড় হয়ে উঠেছিলেন তিনি। বাবার কাছে শিখেছিলেন কুরআনের গভীর আলো, ন্যায়-অন্যায়ের স্পষ্ট সীমারেখা। ছোটবেলা থেকেই তার মনে জ্বলজ্বল করতো প্রতিবাদের আগুন—যেন তিনি জন্ম থেকেই জানতেন, চুপ করে থাকা তার ধর্ম নয়। মাদ্রাসায় প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হলেন, তখন শুধু পড়াশোনা করতে আসেননি। এসেছিলেন এই সমাজের অন্ধকার কোণগুলো দেখতে, বৈষম্যের মুখোমুখি হতে।
জীবন সহজ ছিল না। প্রাইভেট টিউশনি করে, কোচিং সেন্টারে শিক্ষকতা করে নিজের খরচ চালাতেন। অনেক রাত জেগে পড়াশোনা, দিনের পর দিন সংগ্রাম। শেষমেশ একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হয়ে দাঁড়ালেন। সেখানে ছাত্রদের পড়াতেন রাষ্ট্র, রাজনীতি, সমাজ—কিন্তু তার হৃদয়ে ছিল একটাই আকাঙ্ক্ষা: একটি ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা, যেখানে কোনো আধিপত্যবাদের ছায়া পড়বে না, যেখানে জনগণের কণ্ঠ সবচেয়ে জোরালো হবে।
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় লিখেছে। সেই আন্দোলনের সম্মুখসারিতে দাঁড়িয়ে ছিলেন ওসমান হাদি। রাজপথে শহীদদের রক্তের দাবি তুলে ধরে, অকুতোভয় কণ্ঠে বলতেন, “এই লড়াই থামবে না!” তার বক্তৃতা শুনে হাজারো যুবক উজ্জীবিত হতো। আন্দোলনের পর তিনি গড়ে তুললেন ‘ইনকিলাব মঞ্চ’—একটি সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম, যার লক্ষ্য ছিল সব ধরনের অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো, স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা। তিনি ছিলেন এর মুখপাত্র, আহ্বায়ক। তার কথায় ছিল সরলতা, আগুন আর গভীর বিশ্বাস। বলতেন, “সহজতাই আভিজাত্য”—এক কাপ চা আর সিঙ্গারার সাধারণ আড্ডায় জনগণের সঙ্গে মিশে যেতেন। কোনো দূরত্ব রাখতেন না।
২০২৫ সালে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে নামলেন। তার প্রচারণা ছিল অনন্য—ফজরের নামাজের পর মসজিদের সামনে দাঁড়িয়ে ভোট চাইতেন, হাসিমুখে বলতেন, “এই দেশ আমাদের সবার, আমরা একসঙ্গে বাঁচিয়ে রাখব।” তার সাহস, তার স্পষ্টভাষী মন্তব্য অনেককে আকর্ষণ করতো। কিন্তু এই সোজা পথই হয়ে উঠল তার জন্য বিপদ।
২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর, বিজয়নগরের রাস্তায় রিকশায় বসে গণসংযোগ করছিলেন। হঠাৎ চলন্ত মোটরসাইকেল থেকে এলো গুলি। মাথায় লাগলো সেই নির্মম বুলেট। রক্তে ভিজে গেল রাজপথ। খবরটা ছড়িয়ে পড়তেই দেশ থমকে দাঁড়াল। ঢাকা মেডিকেলে প্রথম চিকিৎসা, তারপর এভারকেয়ার হাসপাতালে অস্ত্রোপচার। অবস্থা ছিল আশঙ্কাজনক। উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে নেওয়া হলো তাকে। সারা দেশের মানুষ দোয়ায় ভাসালো—মসজিদে, মন্দিরে, ঘরে ঘরে প্রার্থনা। কত আশা ছিল! কত বিশ্বাস যে হাদি ভাই ফিরে আসবেন, আবার রাজপথে দাঁড়াবেন!
কিন্তু ভাগ্য অন্যরকম লিখেছিল। ১৮ ডিসেম্বর, সিঙ্গাপুরের হাসপাতালে শেষ অস্ত্রোপচারের পর তিনি চলে গেলেন না ফেরার দেশে। শহীদ হয়ে গেলেন ওসমান হাদি। সেই মুহূর্তটা কল্পনা করুন—যে যুবক বলতেন, “মৃত্যুর ভয় দেখিয়ে লাভ নেই, লড়াই চলবে”, সেই হাদি এখন নেই। তার মা-বাবার কান্না, ভাইবোনের আর্তনাদ, সমর্থকদের হাহাকার—সব মিলে এক অবর্ণনীয় শোকের সমুদ্র। শাহবাগে, রাজপথে হাজারো যুবক জড়ো হয়ে কাঁদলো। আবরার ফাহাদ, আবু সাঈদের কাতারে যোগ দিলেন হাদি। কেন এই নির্মমতা? তার অপরাধ কী ছিল? শুধু ন্যায়ের কথা বলা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো।
ওসমান হাদি চলে গেলেন, কিন্তু তার আদর্শ রয়ে গেল আমাদের হৃদয়ে জ্বলজ্বলে তারার মতো। তিনি দেখিয়ে গেলেন, একজন গ্রামের সাধারণ ছেলে কত বড় স্বপ্ন দেখতে পারে, কত সাহসে লড়াই করতে পারে। তার হাসি, তার কণ্ঠ, তার ভালোবাসা—এসব মনে পড়লে আজও চোখ ভিজে যায়। তিনি শহীদ, তিনি অমর। যুবসমাজের কাছে তিনি এক প্রেরণা। তার রক্ত বৃথা যাবে না। আমরা তার স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখব, লড়াই চালিয়ে যাব। ওসমান হাদি নেই, কিন্তু তার কণ্ঠ এখনো বাতাসে গুঞ্জরিত: “লড়াই চলবে!”
ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। আল্লাহ হাদি ভাইকে জান্নাতুল ফিরদাউস নসীব করুন। তার শাহাদাত আমাদের ঘুম ভাঙাক, নতুন লড়াইয়ের শক্তি দিক।
#শহীদওসমানহাদি #OsmanHadi #ইনকিলাবমঞ্চ #জুলাইবিপ্লব #লড়াইচলবে #জান্নাতুলফিরদাউস #ন্যায়েরলড়াই #বাংলাদেশ২০২৫
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।